অর্থনীতির খবর, রাজশাহী : গত এক বছরে বিভিন্ন আর্থিক সূচকে অভাবনীয় অগ্রগতি অর্জন করেছে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব), যা উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি সঞ্চারের আশা জাগিয়েছে।
ব্যাংকটির আমানত বেড়েছে ৮৫৫.৭১ কোটি টাকা এবং একই সময়ে নিট লোকসান কমেছে ১৭১.১৫ কোটি টাকা।
ব্যাংক কর্তৃপক্ষের মতে, আঞ্চলিক পর্যবেক্ষণ, মাঠ পর্যায়ে নিয়মিত নির্দেশনা এবং বিভিন্ন সংস্কারমূলক পদক্ষেপের কারণেই বর্তমান ব্যবস্থাপনার অধীনে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে।
১৯৮৭ সালের ১৫ মার্চ প্রতিষ্ঠার পর থেকে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ১৬টি জেলায় উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষকদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে কাজ করে আসছে রাকুব।
অন্যান্য তফসিলি ব্যাংকের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে প্রতিষ্ঠানটি সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকটি সূচকে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সঙ্গে গভর্নরের সাম্প্রতিক বৈঠকে রাকাবের এই অগ্রগতির প্রশংসা করা হয়।
তথ্য অনুযায়ী, গত ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে ব্যাংকটির আমানত বেড়েছে ৮৫৫.৭১ কোটি টাকা, যা অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে সর্বোচ্চ।
অন্যদিকে, ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে ব্যাংকটির নিট লোকসান ছিল ২৮৯.৩৯ কোটি টাকা। গত অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ১১৮.২৪ কোটি টাকায়। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে নিট লোকসান কমেছে ১৭১.১৫ কোটি টাকা।
শ্রেণীকৃত ঋণের বিপরীতে ব্যাংকটির প্রভিশন বা সঞ্চিতির পরিমাণও কমেছে। আগের অর্থবছরে যেখানে সঞ্চিতির পরিমাণ ছিল ৭০২.৮৭ কোটি টাকা, গত অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৬৮৯.৭৪ কোটি টাকায়—অর্থাৎ সঞ্চিতি কমেছে ১৩.১৩ কোটি টাকা।
ব্যাংক সূত্রের খবর, বর্তমানে বিভিন্ন তফসিলি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার যেখানে ৩০ শতাংশের বেশি, সেখানে রাকুবের শ্রেণীকৃত ঋণের (CL) হার প্রায় ১৬ শতাংশ।
ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের আর্থিক স্বস্তি দিতে সরকারের বিশেষ উদ্যোগ দেশের প্রথম ব্যাংক হিসেবে সফলভাবে বাস্তবায়ন করেছে রাকাব। এর অধীনে সুদে-আসলে ১০,০০০ টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ মওকুফ/পরিশোধ করা হয়েছে।
এই কর্মসূচির আওতায় মোট ২,২৯,৯৩৩টি কৃষক পরিবারের ঋণ বাবদ ২২৫ কোটি ৭৪ লাখ ৯৯ হাজার টাকা সরকারের মাধ্যমে পরিশোধ করা হয়েছে। রংপুর বিভাগের ১,৭৯,২৭৮টি পরিবারের ১৭৮ কোটি ৯২ লাখ ৪৮ হাজার টাকা এবং রাজশাহী বিভাগের ৫০,৬৩৭টি পরিবারের ৪৬ কোটি ৮১ লাখ ৩৯ হাজার টাকার ঋণ সরকার শোধ করেছে।
ব্যাংকের সার্বিক কার্যক্রম গতিশীল করতে নতুন অর্গানোগ্রাম, গৃহনির্মাণ ঋণ নীতি এবং মোটরসাইকেল ঋণ নীতিসহ নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া সরকারের ঘোষিত ৩,০০০ কোটি টাকার প্যাকেজের অধীনে নতুন কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ আশা করছে, এসব উদ্যোগ উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি ও কৃষকদের আর্থিক পরিস্থিতির উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখবে।
বিভিন্ন ধরনের কেনাকাটায় খরচ কমানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) খাতের কেনাকাটায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে কড়া নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
অতীতের নানা বাধা পেরিয়ে ব্যাংকটি যখন ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, তখন একটি গোষ্ঠী নানাভাবে বিঘ্ন সৃষ্টির অপচেষ্টা চালাচ্ছে। ৩৮ বছরে রাকাবের প্রায় ৬০ জন ব্যবস্থাপনা পরিচালক পরিবর্তন হয়েছেন। বিভিন্ন সময়ে মব সৃষ্টি, অপ্রচার ও ভয়ভীতি দেখিয়ে ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের স্বাভাবিক কাজকর্মে বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে।
রাকাবের মহাব্যবস্থাপক তাজ উদ্দিন জানান, উত্তরাঞ্চলের কৃষকদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে রাকাব নানা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সব বিদ্যমান বাধা অতিক্রম করে রাকাব এগিয়ে যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আর্থিক সূচকের এই ধারা বজায় রেখে তারা কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে চায় এবং ভবিষ্যতে কৃষকবান্ধব কর্মসূচি নিয়ে কৃষকদের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে।






