অগ্রণী ব্যাংক: চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে পুনর্জাগরণের নতুন সম্ভাবনা

অগ্রণী ব্যাংক: চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে পুনর্জাগরণের নতুন সম্ভাবনা

✍️ আগা আজিজুল ইসলাম চৌধুরী

সভাপতি, ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ব্যাব)

বাংলাদেশের আর্থিক খাতের বিকাশ, কৃষি ও শিল্পে অর্থায়ন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা উন্নয়ন, রপ্তানি-আমদানি বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং প্রবাসী আয় ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিন ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে ভূমিকা রেখে আসছে। রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক হিসেবে এর বিস্তৃত সেবা নেটওয়ার্ক, সাধারণ মানুষের আস্থা এবং জাতীয় অর্থনীতির সঙ্গে গভীর সম্পৃক্ততা—সব মিলিয়ে অগ্রণী ব্যাংক কেবল একটি ব্যাংক নয়; এটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবাহের অন্যতম শক্তিশালী অবকাঠামো।

৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ ভিত্তিক সাময়িকভাবে হিসাবকৃত আর্থিক বিবরণী বিশ্লেষণ করলে ব্যাংকটির বর্তমান আর্থিক অবস্থার একটি বাস্তবচিত্র স্পষ্ট হয়। উপাত্ত বলছে, ব্যাংকটির মোট আমানত ১,১৩,০২৯.২৯ কোটি টাকা—যা জনগণের অব্যাহত আস্থা, বাজারে ব্যাংকটির গ্রহণযোগ্যতা এবং রাষ্ট্রীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি মানুষের বিশ্বাসের প্রতিফলন। একইসঙ্গে মোট ঋণ ও অগ্রিম ৮০,৫৭৩.৩৫ কোটি টাকা, যা কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য ও সেবা খাতে অগ্রণী ব্যাংকের বিস্তৃত অর্থনৈতিক অবদানকে তুলে ধরে।

অগ্রণী ব্যাংকের ৯৭৯টি শাখা এবং ১০,৫৯৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দেওয়ার এক অসাধারণ সক্ষমতা তৈরি করেছে। গড়ে প্রতি শাখায় প্রায় ১১ জন জনবল নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি সেবা পরিচালনা করছে। এই বিশাল মানবসম্পদ, সঠিক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ও পারফরম্যান্সভিত্তিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আরও বেশি উৎপাদনশীল শক্তিতে রূপান্তরিত হতে পারে। প্রতি কর্মীর তত্ত্বাবধানে গড়ে প্রায় ৭.৬০ কোটি টাকার ঋণ পোর্টফোলিও রয়েছে—যা মানবসম্পদের ওপর আস্থা এবং একইসঙ্গে দক্ষ ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তারও প্রতিফলন।

আর্থিক কার্যক্রমে ব্যাংকটির ১,১২৯.৭৪ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা দেখায় যে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক ভিত্তি এখনো শক্তিশালী এবং আয়ের সক্ষমতা বিদ্যমান। তবে টেকসই মুনাফা নিশ্চিত করতে সম্পদের গুণগত মান উন্নয়ন জরুরি। বর্তমানে মোট শ্রেণীকৃত ঋণের পরিমাণ ২৮,৬১৫.৬৪ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩৫.৫২ শতাংশ। এর মধ্যে ১৬,৯৯১.৩৮ কোটি টাকা মামলাকৃত ঋণ, যা বিশেষায়িত আইনি ও ব্যবস্থাপনাগত উদ্যোগের মাধ্যমে পুনরুদ্ধারের সুযোগ সৃষ্টি করে। দীর্ঘদিনের আটকে থাকা এ অর্থ পুনঃপ্রবাহে ফিরিয়ে আনতে পারলে ব্যাংকের তারল্য, মুনাফা এবং মূলধন সক্ষমতা—সবকিছুতেই ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন ১৫,৯১৯.৮৩ কোটি টাকা, যেখানে বর্তমানে সংরক্ষিত রয়েছে ৬,৯৪৫.৭৭ কোটি টাকা। ফলে প্রভিশন ঘাটতি ৮,৯৭৪ কোটি টাকা ধাপে ধাপে পূরণের সুযোগ রয়েছে। এটি পূরণ করতে পারলে ব্যাংকের ব্যালেন্স শিট আরও বাস্তবসম্মত, স্বচ্ছ ও শক্তিশালী হবে। একইভাবে মূলধন পর্যাপ্ততার হার (CRAR) বর্তমানে ২.২৩ শতাংশ, যেখানে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ধীরে ধীরে ১০ শতাংশ বা তার বেশি অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা যেতে পারে। একটি সময়বদ্ধ Capital Restoration Roadmap বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই সক্ষমতা অর্জন সম্পূর্ণ সম্ভব।

নিয়মিত ঋণের বিপরীতে যোগ্য জামানত কভারেজ ৫০.৩৬ শতাংশ—এখানে উন্নয়নের বড় সুযোগ রয়েছে। আধুনিক জামানত মূল্যায়ন ব্যবস্থা, তৃতীয় পক্ষের মূল্যায়ন (Third-party Valuation), তথ্যভিত্তিক ঋণ অনুমোদন এবং Early Warning System চালু হলে ঋণের গুণগত মান দ্রুত উন্নত হতে পারে। একইসঙ্গে বড় ঋণগুলোর ওপর স্বাধীন পর্যালোচনা, ঝুঁকিভিত্তিক ব্যবস্থাপনা, দ্রুত ঋণ পুনরুদ্ধার এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি কাঠামো গড়ে তুলতে পারলে ব্যাংকটি স্বল্প সময়েই দৃশ্যমান পরিবর্তনের পথে এগোতে পারবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—অগ্রণী ব্যাংকের রয়েছে একটি শক্তিশালী ঐতিহ্য, বিস্তৃত গ্রাহকভিত্তি, অভিজ্ঞ মানবসম্পদ, রাষ্ট্রীয় আস্থা এবং বাজারে সুপ্রতিষ্ঠিত অবস্থান। এ ধরনের ভিত্তি অনেক প্রতিষ্ঠানের থাকে না। ফলে এটিকে পুনর্গঠন নয়, বরং পুনর্জাগরণ বলাই অধিকতর উপযুক্ত।

আজ প্রয়োজন নীতিগত সহায়তা, আধুনিক ব্যবস্থাপনা, সুশাসন, জবাবদিহিতা এবং সম্মিলিত উদ্যোগ। সরকারের কৌশলগত সহযোগিতা, –এর নীতিগত সহায়তা, পরিচালনা পর্ষদের দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেশাদার দায়িত্ববোধ—এই চারটি শক্তির সমন্বয় ঘটাতে পারলে অগ্রণী ব্যাংক খুব দ্রুতই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকিং খাতে একটি Benchmark Institution হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।

অগ্রণী ব্যাংকের সামনে চ্যালেঞ্জ আছে—কিন্তু সম্ভাবনা তার চেয়েও অনেক বড়।

সঠিক সিদ্ধান্ত, সময়োপযোগী সংস্কার এবং পেশাদার নেতৃত্বের মাধ্যমে এই প্রতিষ্ঠান আবারও দেশের ব্যাংকিং খাতের অগ্রযাত্রার প্রধান প্রতীকে পরিণত হতে পারে।

একটি শক্তিশালী অগ্রণী ব্যাংক মানেই—একটি আরও শক্তিশালী বাংলাদেশ।