দুর্নীতি-অনিয়মে জর্জরিত সাবেক এমডি মজিবর, নিয়োগ-বদলি ও প্রমোশন বাণিজ্যে গড়েছেন সম্পদের পাহাড়   

 

দুর্নীতি-অনিয়মে জর্জরিত সাবেক এমডি মজিবর, নিয়োগ-বদলি ও প্রমোশন বাণিজ্যে গড়েছেন সম্পদের পাহাড়

 

 

জনতা ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. মজিবর রহমানের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করেছে সরকার। তার বিরুদ্ধে ঘুষ, পদোন্নতি ও বদলি-বাণিজ্য, আইন কর্মকর্তা নিয়োগে স্বজনপ্রীতি, আর্থিক অনিয়ম এবং প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতাসহ বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছে।

 

 

সোমবার (১৯ অক্টোবর) অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের উপ-সচিব আফরোজা আক্তার রিবা স্বাক্ষরিত এক আদেশে মজিবর রহমানের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিলের সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে।

 

ব্যাংক কোম্পানি আইন ও জনতা ব্যাংকের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিপত্র অনুযায়ী তার নিয়োগের অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিল করা হয় বলে আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

এদিকে মজিবর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির কমিশনের নামে ১ কোটি ৯ লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণ, সুদ মওকুফ ও ঋণ পুনঃতফসিলের মাধ্যমে ঋণ গ্রহীতাদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা নেওয়া, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক আনুকূল্য এবং নিজস্ব লোকজনের মধ্যে টেন্ডার বরাদ্দসহ নানা অনিয়মে জড়িত ছিলেন তিনি।

 

এছাড়া স্টাফ হাউস বিল্ডিং লোনের বিষয়ে মিথ্যা অজুহাতে সাত কর্মকর্তাকে বদলি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ, ক্ষমতার অপব্যবহার করে শাখা ব্যবস্থাপকদের যখন-তখন বদলি এবং শাখা ব্যবস্থাপক নিয়োগে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। কর্মকর্তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগও করেছেন সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি।

 

অভিযোগ রয়েছে, রূপালী ব্যাংক থেকে জনতা ব্যাংকে যোগ দেওয়া কয়েকজন জিএম ও ডিএমডিকে নিয়ে রূপালী ব্যাংকের একটি বলয় গড়ে তুলেছিলেন মজিবর রহমান। এই বলয়ের মাধ্যমে ব্যাংকের বিভিন্ন কার্যক্রমে একক আধিপত্য বিস্তার করে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনি। এতে জনতা ব্যাংকের অনেক জিএম ও ডিজিএম স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারতেন না বলেও অভিযোগ রয়েছে।

 

 

 

জানা যায়, জনতা ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপকদের অনেকেই তিন বছর দায়িত্ব পালন করতে পারেন না। বিভিন্ন অজুহাতে তাদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিয়ে নতুন কর্মকর্তাদের শাখা ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, নতুন দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে জনপ্রতি কমপক্ষে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। এ কাজে একটি সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। ওই সিন্ডিকেটই কারা শাখা ব্যবস্থাপক হবেন এবং কাদের সরিয়ে দেওয়া হবে, তার তালিকা তৈরি করতো বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

 

 

 

 

 

এজিএম-ডিজিএম পদোন্নতিতে আগেই চুক্তির অভিযোগ

২০২৫ সালের এজিএম ও ডিজিএম পদে পদোন্নতি নিয়েও আগাম চুক্তির পাঁয়তারা ছিল বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন কর্মকর্তা।

 

তাদের অভিযোগ, অন্য কোনো গ্রেডে পদোন্নতি দেওয়ার বিষয়ে আগ্রহ কম থাকলেও এজিএম ও ডিজিএম পদে পদোন্নতি দিয়ে অর্থ আয়ের বিষয়ে বেশি উৎসাহী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। এসব পদে টার্গেট নিয়ে অর্থ দিতে ইচ্ছুক কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগে একটি চক্র এখনো সক্রিয় রয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। ভাইভা শুরুর আগেই চুক্তির কাজ শেষ করার জন্য ওই চক্র তৎপর বলে দাবি করেছেন অভিযোগকারীরা।

 

কর্মকর্তাদের অভিযোগ, অর্গানোগ্রাম অনুমোদন করিয়ে সব গ্রেডে পদোন্নতি দেওয়ার পক্ষে ছিলেন না সাবেক এমডি মজিবর। তাদের দাবি, এজিএম ও ডিজিএম ছাড়া অন্য গ্রেডে পদোন্নতি দিয়ে অর্থ আয়ের সুযোগ তুলনামূলক কম ছিল। ফলে নিজের মেয়াদ তিন বছর পূর্ণ হওয়ার আগ পর্যন্ত পদটি পাকাপোক্ত করতে প্রয়োজনীয় অর্থ জনতা ব্যাংক ও ব্যাংকের কর্মকর্তাদের কাছ থেকেই আদায়ের চেষ্টা চালাতেন তিনি।

 

খেলাপি ঋণ আদায়ে নিষ্ক্রিয়তা

এদিকে, ব্যাংকের খেলাপি ঋণ আদায়ে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য না থাকলেও প্রভাবশালী ঋণ খেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে নিষ্ক্রিয় থাকার অভিযোগ উঠেছে এমডি মজিবর রহমানের বিরুদ্ধে। সুবিধা নিয়ে রাঘব বোয়ালদের ব্যাপারে নীরব থাকার অভিযোগও করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

 

কোনো অভিযোগ আমলে নেয়নি জনতা ব্যাংক কর্তৃপক্ষ

এদিকে, জনতা ব্যাংক পিএলসির পক্ষ থেকে এসব অভিযোগের বিষয়ে বলা হয়েছে, অভিযোগগুলোর কোনো ভিত্তি নেই। ব্যাংক কর্তৃপক্ষের দাবি, সাবেক এমডি মো. মজিবর রহমানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো সঠিক নয় এবং এসব অভিযোগের কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই।

 

উল্লেখ্য, জুন শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৫ হাজার ৭২৯ কোটি টাকা, যা ব্যাংকটির বিতরণ করা মোট ঋণের প্রায় ৭৫ শতাংশ।

 

জনতা ব্যাংকের শীর্ষ ঋণ খেলাপি যারা

নাম প্রকাশ না করার শর্তে জনতা ব্যাংকের কর্মকর্তারা ভিওডি বাংলাকে জানান, ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের বড় একটি অংশ কয়েকটি প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর কাছে আটকে রয়েছে।

 

কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, জনতা ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণের প্রায় ৮০ শতাংশই শীর্ষ ২০ ঋণ খেলাপির কাছে। এ তালিকায় বেক্সিমকো, এস আলম ও অ্যাননটেক্সসহ কয়েকটি বড় ব্যবসায়ী গ্রুপ রয়েছে।

 

ব্যাংকটির ঝুঁকিতে থাকা ঋণের প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা একাই বেক্সিমকো গ্রুপের কাছে রয়েছে। এছাড়া বড় ঋণ খেলাপিদের মধ্যে রয়েছে ক্রিসেন্ট গ্রুপ ও থার্মেক্স গ্রুপ।