ব্যাংকিং খাতের বর্তমান সংকট ও নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ এবং অগ্রণী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ বলেন, “সাবেক অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানের আমলে ব্যাংকে এমডি নিয়োগে মেধা ও অভিজ্ঞতা যাচাইয়ের জন্য গঠিত ‘সার্চ কমিটি’ একটি অত্যন্ত কার্যকর ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে প্রথিত ফ্যাসিস্ট সরকার সেই সার্চ কমিটির তোয়াক্কা না করে নিজেদের খেয়ালখুশিমতো রাজনৈতিক ব্যক্তিদের শীর্ষ পদে নিয়োগ দেওয়ার প্রথা শুরু করে।”তাঁর মতে, একতরফা ও অস্বচ্ছ নিয়োগপ্রক্রিয়ার কারণে বহু যোগ্য, মেধাবী ও দক্ষ ব্যাংকার পদবঞ্চিত হয়েছেন। অন্যদিকে, অযোগ্য ব্যক্তিদের শীর্ষ পদে বসানোর ফলে ব্যাংকিং খাতের গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সূচকে অবনতি ঘটেছে এবং সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থায় অস্থিরতা বেড়েছে।
আশ্রাফুল আলম নোবেল পাটোয়ারী, ঢাকা:
রাষ্ট্রের অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড বলা হয় আর্থিক খাতকে। অথচ দীর্ঘদিন ধরে অবহেলা, অনিয়ম ও ভুল নীতিনির্ধারণের কারণে দেশের ব্যাংকিং খাত নানা সংকটে জর্জরিত। খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর শীর্ষ পদে—বিশেষ করে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগে স্বচ্ছতা ও মেধাভিত্তিক প্রক্রিয়ার অভাব ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা ও সুশাসনকে দুর্বল করে দেওয়ার অন্যতম কারণ।
তাঁদের অভিযোগ, ঐতিহ্যবাহী ‘সার্চ কমিটি’ বা উন্মুক্ত বাছাইপ্রক্রিয়া বন্ধ করে আমলাতান্ত্রিক ও প্রশাসনিক পছন্দের ভিত্তিতে এমডি নিয়োগের যে ব্যবস্থা চালু হয়েছে, তা সরকারি ব্যাংকগুলোর কার্যকারিতা ও পেশাদার নেতৃত্বের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এ পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে এমডি নিয়োগে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সার্চ কমিটি পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি জোরালো হচ্ছে।
সার্চ কমিটি বিলোপ, প্রশ্নবিদ্ধ নিয়োগপ্রক্রিযয়া
একসময় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীর পদ শূন্য হলে নিরপেক্ষ ও দক্ষ সার্চ কমিটির মাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে আবেদন আহ্বান করা হতো। এতে অভিজ্ঞ, মেধাবী ও দক্ষ ব্যাংকাররা প্রতিযোগিতার সুযোগ পেতেন। সার্চ কমিটি আবেদন যাচাই-বাছাই ও সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের জন্য দুজন যোগ্য প্রার্থীর নাম সুপারিশ করত। পরবর্তী সময়ে সরকারি অনুমোদনের ভিত্তিতে তাঁদের মধ্য থেকে একজনকে নিয়োগ দেওয়া হতো।
কিন্তু পরবর্তীতে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব বজায় রাখার অভিযোগের মধ্যে স্বচ্ছ বাছাইপ্রক্রিয়াটি বন্ধ হয়ে যায়। সার্চ কমিটির পরিবর্তে উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) পদ থেকে সরাসরি পছন্দের ব্যক্তিকে এমডি হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার একতরফা ব্যবস্থা চালু হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও পেশাগত দক্ষতার পরিবর্তে রাজনৈতিক আনুগত্য এবং প্রশাসনিক সুপারিশ গুরুত্ব পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ঘন ঘন নীতিমালা পরিবর্তনে যোগ্যদের বঞ্চনার অভিযোগ
সাম্প্রতিক সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর শীর্ষ পদে নিয়োগ নিয়ে অসন্তোষ বেড়েছে। অভিযোগ উঠেছে, এক বছরের মধ্যে অন্তত তিনবার নিয়োগের শর্ত বা নীতিমালা পরিবর্তন করা হয়েছে। নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা পছন্দের প্রার্থীদের সুযোগ করে দিতেই বারবার নিয়োগবিধি পরিবর্তন ও শিথিল করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিন সততা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে কাজ করা জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের যথাযথ মূল্যায়ন না করার অভিযোগও রয়েছে। তাঁদের মতে, শীর্ষ পদে যোগ্য, অভিজ্ঞ ও স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম নেতৃত্ব না থাকলে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং মূলধনসংকট মোকাবিলায় কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন কঠিন।
বেসরকারি ব্যাংক থেকে এমডি নিয়োগের উদ্যোগ নিয়ে বিতর্ক
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে যোগ্য প্রার্থীর অভাব রয়েছে—এমন যুক্তিতে বেসরকারি ব্যাংক থেকে চুক্তিভিত্তিক এমডি নিয়োগের আলোচনা ও উদ্যোগের খবরেও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সরকারি ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালন সংস্কৃতি ও বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যের সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট সেবা ও নীতিগত দায়িত্বের পার্থক্য রয়েছে। ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ কাঠামো, কার্যক্রম ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা ছাড়া বাইরের কাউকে শীর্ষ পদে নিয়োগ দিলে তা নতুন জটিলতা তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে সরকারি ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা অভিজ্ঞ ও পেশাদার কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা বাড়তে পারে।
ব্যাংকিং খাতের বর্তমান সংকট ও নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ এবং অগ্রণী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ বলেন, “সাবেক অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানের আমলে ব্যাংকে এমডি নিয়োগে মেধা ও অভিজ্ঞতা যাচাইয়ের জন্য গঠিত ‘সার্চ কমিটি’ একটি অত্যন্ত কার্যকর ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে প্রথিত ফ্যাসিস্ট সরকার সেই সার্চ কমিটির তোয়াক্কা না করে নিজেদের খেয়ালখুশিমতো রাজনৈতিক ব্যক্তিদের শীর্ষ পদে নিয়োগ দেওয়ার প্রথা শুরু করে।”তাঁর মতে, একতরফা ও অস্বচ্ছ নিয়োগপ্রক্রিয়ার কারণে বহু যোগ্য, মেধাবী ও দক্ষ ব্যাংকার পদবঞ্চিত হয়েছেন। অন্যদিকে, অযোগ্য ব্যক্তিদের শীর্ষ পদে বসানোর ফলে ব্যাংকিং খাতের গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সূচকে অবনতি ঘটেছে এবং সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থায় অস্থিরতা বেড়েছে।
বোর্ডের মতামত উপেক্ষা করে পদোন্নতি ও নিয়োগের অভিযোগ।ব্যাংকের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে পদোন্নতি ও নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ বলেন, বর্তমানে মহাব্যবস্থাপক (জিএম), উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) কিংবা ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগের ক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদের মতামত সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয় বলে তিনি মনে করেন। এতে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা ও কার্যক্রম সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা ছাড়াই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।তিনি এ ধরনের প্রক্রিয়ার কয়েকটি নেতিবাচক দিক তুলে ধরেন। তাঁর মতে—
সততা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে কাজ করা পেশাদার কর্মকর্তারা পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
পরিচালনা পর্ষদের সুপারিশ ও যথাযথ মূল্যায়নের পরিবর্তে প্রশাসনিক পছন্দের ভিত্তিতে কিছু কর্মকর্তা দ্রুত পদোন্নতি পাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
শীর্ষ পদে দায়িত্ব পাওয়ার পরও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত ফলাফল ও কার্যগত গতি পাওয়া যাচ্ছে না বলে সমালোচনা রয়েছে।
এর ফলে ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম, সুশাসন ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত ব্যাংক ও জনগণ উভয়ের ওপর পড়ছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত।
তিন ব্যাংকের এমডি নিয়োগ বাতিলের পরও অনিশ্চয়তা
সম্প্রতি সোনালী, জনতা ও রূপালী ব্যাংকের এমডিদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করা হলেও নতুন নিয়োগপ্রক্রিয়া এবং যোগ্য নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে এখনো সুনির্দিষ্ট কাঠামো দৃশ্যমান নয় বলে সংশ্লিষ্ট মহলে উদ্বেগ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞ ও পেশাজীবীদের মতে, শুধু নিয়োগ বাতিল করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। বরং ভবিষ্যতে যাতে নিয়োগপ্রক্রিয়া রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত থাকে, সে জন্য স্বচ্ছ, স্থায়ী ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।
সার্চ কমিটি পুনঃপ্রতিষ্ঠাসহ তিন দফা দাবি
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের শীর্ষ নেতৃত্ব নির্বাচনে স্বচ্ছতা, পেশাদারত্ব ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ব্যাংকিং খাতের বিশেষজ্ঞ ও পেশাজীবীরা কয়েকটি দাবি তুলে ধরেছেন।
১. স্বাধীন সার্চ কমিটি পুনঃপ্রতিষ্ঠা: উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে আবেদন আহ্বান, যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা যাচাই এবং নিরপেক্ষ মূল্যায়নের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ যোগ্য প্রার্থীদের সুপারিশ করার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।
২. স্বচ্ছ ও স্থিতিশীল নিয়োগবিধি:ঘন ঘন নিয়োগের নীতিমালা পরিবর্তন বন্ধ করে নিরপেক্ষ, সুস্পষ্ট ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নিয়োগবিধি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।
৩. অভ্যন্তরীণ মেধা ও অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন: রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা যোগ্য, অভিজ্ঞ ও দক্ষ ব্যাংকারদের যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে, যাতে পেশাগত দক্ষতা ও কর্মদক্ষতা পদোন্নতি ও নিয়োগের প্রধান ভিত্তি হয়।
মেধাভিত্তিক নেতৃত্বই ব্যাংকিং খাত পুনরুদ্ধারের পথ
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো দেশের অর্থনীতি, শিল্প-বাণিজ্য, কর্মসংস্থান ও জনসেবার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। এসব প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নেতৃত্ব নির্বাচনে স্বচ্ছতা, দক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক আনুগত্য, ব্যক্তিগত পছন্দ কিংবা প্রশাসনিক প্রভাবের পরিবর্তে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও পেশাগত সততাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। স্বাধীন সার্চ কমিটি পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং স্থিতিশীল নিয়োগবিধি কার্যকর করা গেলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে পেশাদার নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হতে পারে।
আর্থিক খাতকে সংকট থেকে উত্তরণে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হলে মেধাভিত্তিক নেতৃত্ব নির্বাচন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।
(গবেষণামূলক সংবাদটি করেছেন : আশ্রাফুল আলম নোবেল পাটোয়ারী,নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক অর্থনীতির খবর ও সাপ্তাহিক অর্থ বাণিজ্য, ঢাকা।
ফেইসবুক: https://www.facebook.com/share/1KJfw6z3Bo/
ইমেইল: [email protected])






