মেধার নির্বাসন ও একটি খাদের কিনারায় দাঁড়ানো ব্যাংকিং খাত

আশ্রাফুল আলম নোবেল পাটোয়ারী ::

আমার ক্ষোভ, হতাশা এবং ব্যাংকিং সেক্টরের বর্তমান সংকট নিয়ে সুস্পষ্ট পর্যবেক্ষণকে উপজীব্য করে একটি বিষাদ প্রবন্ধ নিচে দেওয়া হলো: AANP

মেধার নির্বাসন ও একটি খাদের কিনারায় দাঁড়ানো ব্যাংকিং খাত

যে ব্যাংকিং খাত একটি দেশের অর্থনীতির হৃৎস্পন্দন, তা আজ পক্ষাঘাতগ্রস্ত। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে শীর্ষ পদে—বিশেষ করে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদে—যোগ্য ও দক্ষ নেতৃত্বের যে অভূতপূর্ব শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়; বরং এটি দীর্ঘদিনের ভুল নীতি, অনভিজ্ঞতা, দূরদৃষ্টির অভাব এবং চরম স্বজনপ্রীতি ও চাটুকারিতার এক বিষাদময় পরিণাম।

যোগ্যতার বিসর্জন ও কৃত্রিম শূন্যতা

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে কখনোই অভিজ্ঞ ও মেধাভিত্তিক নেতৃত্বের অভাব ছিল না। বিশেষ করে সোনালী, অগ্রণী ও জনতা ব্যাংকের মাঠপর্যায়ে কাজ করা ব্যাচভিত্তিক (যেমন—৯৩ ও ৯৪ ব্যাচ) অনেক সৎ, দক্ষ ও ইতিবাচক মানসিকতার ব্যাংকার ছিলেন, যাঁরা ঋণ অনুমোদন, রিকভারি এবং শাখা পরিচালনায় দশকের পর দশক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, নীতি-নির্ধারকদের অদক্ষতা ও পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের কারণে সেই অভিজ্ঞতাকে পাশ কাটিয়ে কেবল তেলবাজি ও তদবিরের জোরে মাঠপর্যায়ে অনভিজ্ঞ একদল লোককে উচ্চপদে বসানো হয়েছে।

নীতিমালা, ক্রাইটেরিয়া কিংবা ইন্টারভিউ বোর্ড—সবই আজ কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ। যে ইন্টারভিউ বোর্ডে থাকেন নিজেই মাঠপর্যায়ে অনভিজ্ঞ কিছু মানুষ, সেখানে দুই-চার মিনিটের সংক্ষিপ্ত কথোপকথনে কীভাবে হাজার কোটি টাকার আমানত সামলানোর যোগ্য নেতৃত্ব খুঁজে পাওয়া সম্ভব? এর চড়া মাশুল আজ পুরো জাতিকে দিতে হচ্ছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলার আসামি পর্যন্ত যখন ডিএমডি পদে পদোন্নতি পান, তখন স্পষ্ট হয়ে যায় যে প্রক্রিয়ার ভেতরেই গলদ রয়েছে।

দূরদৃষ্টিহীন নেতৃত্ব ও ব্যাংকের ধ্বংসযজ্ঞ

সাম্প্রতিক সময়ে সোনালী ব্যাংক ব্যতীত অধিকাংশ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে দায়িত্ব পালনকারী শীর্ষ কর্মকর্তারা ব্যাংকিং খাতের প্রকৃত উন্নয়নে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেননি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা গেছে, কোনো ব্রাঞ্চ লেভেলে না খেটে, সরাসরি ঋণ দেওয়ার বাস্তব অভিজ্ঞতা ছাড়া কিংবা মাঠের জটিলতা না বুঝে অনেকেই শীর্ষ পদে বসে মাসের পর মাস মোটা অঙ্কের বেতন-ভাতা উপভোগ করেছেন। কাজের চেয়ে গণমাধ্যমে প্রচারণা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেকে জাহির করতেই তাঁদের মনোযোগ ছিল বেশি।

ফলশ্রুতিতে—

* খেলাপি ঋণের পাহাড়: নিয়মমাফিক লোনের নবায়ন না করা, অহেতুক ফাইল আটকে রাখা এবং সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত না নেওয়ার কারণে ব্যাংকগুলোর লোকসান ও খেলাপির পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।

* বিবেচনাহীন আইনি নিপীড়ন: খেলাপি ঋণ আদায়ে কার্যকরী পদক্ষেপ না নিয়ে সাবেক ব্যাংকারদের বিরুদ্ধে একের পর এক নিষ্পত্তি-অযোগ্য মামলা ঠুকে দেওয়া হয়েছে, যা শুধুই সমস্যার মেয়াদ বাড়িয়েছে।

* দুর্নীতির বিস্তার: একদিকে যোগ্য ব্যাংকারদের অবমূল্যায়ন, অন্যদিকে শাস্তিপ্রাপ্ত ও বিতর্কিত কর্মকর্তাদের বড় বড় কর্পোরেট শাখার ব্যবস্থাপক হিসেবে পুনর্বাসন—ব্যাংকের অর্থ তছরুপের পথকেই প্রশস্ত করেছে। চট্টগ্রাম বা খুলনার মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক হাবগুলোতে বেনামে বা খারাপ পার্টিকে শত শত কোটি টাকার অর্থায়নের যে অনিয়ম ঘটেছে, তা পুরো ব্যাংকিং খাতের ভিত নাড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

কর্মীবান্ধবতাহীন পরিবেশ ও মানসিক বিপর্যয়

একজন প্রকৃত নেতা কেবল অঙ্কের হিসাব মেলান না, তিনি কর্মীবাহিনীকে অনুপ্রাণিত করেন। কিন্তু গত কয়েক বছরে ব্যাংকগুলোতে দেখা গেছে চরম দূরভিসন্ধিমূলক ও প্রতিশোধপরায়ণ প্রশাসনিক আচরণ। দূরবর্তী স্থানে অন্যায্য বদলি, যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত করা এবং কর্মীদের ন্যায্য বিনোদন ও ছুটির সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে একধরনের দমবন্ধ পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল। কর্মচারীদের ওপর এই মানসিক অত্যাচার ও আক্রোশ ব্যাংকের কার্যক্ষমতাকে ভেতর থেকে দুমড়ে-মুচড়ে দিয়েছে। যখন খোদ পরিচালনা পর্ষদের প্রধান কাউকে ‘অথর্ব’ বলে অভিহিত করতে বাধ্য হন, তখন আর বুঝতে বাকি থাকে না যে ভেতরের অবস্থা কতটা পচে গেছে।

পরিণতি: প্রাইভেট খাতের ওপর নির্ভরতা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি

আজ যখন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে এমডি হওয়ার মতো যোগ্য লোক খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না এবং বেসরকারি ব্যাংক থেকে কর্মকর্তা এনে সরকারি ব্যাংকের দায়িত্ব দেওয়ার চিন্তা করা হচ্ছে, তখন তা শুধু একটি খাতের ব্যর্থতা প্রকাশ করে না—বরং পুরো রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থার ঐতিহ্যকে অপমান করে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ভেতরের দক্ষ ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের উপেক্ষা করে তৈরি করা এই কৃত্রিম শূন্যতা আমাদের আর্থিক কাঠামোর জন্য এক চরম কলঙ্ক।

যাঁদের অদক্ষতা, দূরদৃষ্টিহীনতা এবং দুর্নীতির কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো আজ শত শত কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়েছে এবং খেলাপির দাহ্য আগুনে জ্বলছে—তাঁদের দায় অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। শুধু পদ থেকে বিদায় দেওয়াই শেষ কথা হতে পারে না; অনিয়মে জড়িতদের আইনি বিচারের আওতায় আনা এবং রাজ্যকোষ থেকে নেওয়া তাঁদের বেতন ও সুবিধাদি পুনঃরুদ্ধার করা সময়ের দাবি।

উপসংহার:

মেধাবীদের পেছনে ঠেলে দিয়ে যখন অযোগ্য ও চাটুকারদের পদোন্নতি দেওয়া হয়, তখন সেই প্রতিষ্ঠানের পতন ঠেকানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। আজ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর এই করুণ দশা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—অনভিজ্ঞতা ও দুর্নীতির তোষণ কতটা ভয়াবহ হতে পারে। সময় এসেছে এই বিষচক্র ভেঙে যোগ্য, অভিজ্ঞ ও সৎ ব্যাংকারদের হাতে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর লাগাম ফিরিয়ে দেওয়ার।